বাংলাদেশে সমপ্রতি নারীর প্রতি সহিংসতা ভয়ানক রূপ নিয়েছে। ধর্ষণসহ নির্যাতনের পর নির্মমভাবে হত্যা করার খবর প্রতিদিনই পত্রিকার পাতায় প্রকাশ পাচ্ছে। পাশবিকতার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেনা কোমলমতি শিশুরাও। বিশ্ব স্বাস্হ্য সংস্হার  মতে নারীর প্রতি সহিংসতা মহামারীর মতো একটি বৈশ্বিক স্বাস্হ্য সংস্হার  সমস্যায় পরিণত হয়েছে যেখানে প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে একজন  কোন না কোন ধরণের যৌন অথবা শারীরিক সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রকাশিত নারীর প্রতি সহিংসতা সংক্রান্ত জরিপ ২০১৫ এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,  দেশে বিবাহিত নারীদের ৮০ শতাংশই জীবনের কোনো না  কোন পর্যাযে নিজের স্বামীর মাধ্যমে অথবা অন্য কোনোভাবে শারীরিক, মানসিক, যৌন কিংবা অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে, জরিপের তথ্য অনুযায়ী মাত্র ২৩% নারী তার নির্যাতনের কথা প্রকাশ করে এবং মাত্র ৩% নারী আইনী সহায়তার জন্য যোগাযোগ করে। অর্থাৎ পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে আমরা নির্যাতনের যে ঘটনাগুলি দেখি তার চেয়ে অনেক বেশি নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে, যেগুলি অপ্রকাশিত থেকে যাচ্ছে, যার বাস্তব চিত্র আরো ভয়াবহ এবং উদ্বেগজনক। এ থেকে নারীর প্রতি সহিংসতার ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

img_6043tt

 

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি ১৯৯৯ সাল থেকে “বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা” শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন নিয়মিত প্রকাশ করে আসছে। যেখানে সংবাদপত্র থেকে সংগৃহিত তথ্যের পাশাপাশি সমিতির সেবা প্রদানকারী কেন্দ্রের তথ্য,  সমমনা সংগঠনের প্রকাশিত তথ্য এবং নমুনা জরিপ থেকেতথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় সমিতি বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা পরিসি’তি ২০১৫-১৬ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করতে যাচ্ছে। প্রতিবেদনটিতে ধরণ অনুযায়ী নারীর প্রতি সহিংসতা পরিসি’তি বিশ্লেষণের পাশাপাশি নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে এ সময়ে আইন প্রনয়ন ও বিচার বিভাগীয় সিদ্ধান্ত  সংক্রান্ত তথ্যাদি এবং নারীর প্রতি সহিংসতায় অভিযুক্তদের নিয়ে নমুনা জরিপের ফলাফল সন্নিবেশিত করা হয়েছে। আজ এই সংবাদ সম্মেলনেপ্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হবে।

img_6067tt

 

নারীর প্রতি সহিংসতায় অভিযুক্তদের নমুনা জরিপের ফলাফল

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় ২০১৫ সালে দায়েরকৃত মামলায় অভিযুক্তদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও আচরণ বিশ্লেষণে একটি নমুনা জরিপ করা হয়েছে। দেশের সাতটি বিভাগের ৬৬টি থানায় দায়েরকৃত ২৩০৭টি মামলায় যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের মধ্য থেকে দৈব চয়ন পদ্ধতিতে (random sampling) ১৯৮জন কে জরিপের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। যাদের সকলেই পুরুষ। জরিপের ফলাফল থেকে দেখা যায়, সর্বোচ্চ ৩৭% অভিযুক্তদের বয়স ১৮-২৪ বছরের মধ্যে, ২৫-৩৫ বছর বয়সের ৩৪% এবং ১৮ বছরের নিচে অভিযুক্ত ১৫%। তিন-চতুর্থাংশের বেশি অভিযুক্ত ব্যক্তির (৮৬%) বয়স ৩৫ বছর বা এর কম। নারী ও শিশুদের প্রতি নিষ্ঠুর ও ঘৃন্য নির্যাতনের সাথে কোমলমতি শিশু ও তরুণদের জড়িত হওয়া আনুষ্ঠানিক, অনাষ্ঠানিক, সামাজিক ও পারিবারিক নৈতিক শিক্ষারঅভাবকে স্পষ্ট করে তোলে।অন্যদিকে, এক-চতুর্থাংশ (২৪%) ব্যক্তি ধর্ষণ বা ধর্ষণের চেষ্টা করার দায়ে অভিযুক্ত। অথচ বেশির ভাগ অভিযুক্ত ব্যক্তির (৬৭%) বিরুদ্ধে অতীতে অপরাধমূলক কাজে অভিযুক্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায় নি। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, সর্বোচ্চ ২৮% পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন, ২৭% অষ্টম শ্রেণী, ১৭% এসএসসি, ৬% এইচএসসি এবং ৯% স্নাতক পর্যন্ত লেখাপড়া শেষ করেছেন এবং শুধুমাত্র ৭% অভিযুক্ত ব্যক্তি নিরক্ষর। সাক্ষরতা থাকলেই নারীর প্রতি সহিংসতা সংঘটনে সম্পৃক্ত হবে না- এটা বলার সুযোগ নেই। বরং অভিযুক্তদের মধ্যে ৩২% এসএসসি বা এর বেশি লেখাপড়া করেছেন। এতে প্রতীয়মান হয় প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের সঠিক পথ দেখাতে ব্যর্থ। পাঠ্যক্রমে নাগরিক অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে কিছু বিষয় অর্ন্তভুক্ত করা হলেও পাঠদানে সংশ্লিষ্টদের দক্ষতা ও সচেতনতার অভাবে শিক্ষার্থীদের এতদ্‌ বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। সর্বোপরি,পরিবার বা সমাজ মানুষকে নিজের অধিকার সম্পর্কে জানা এবং অপরের অধিকারের বিষয়ে কর্তব্য পালনে উদ্বুদ্ধ করতে পারছে না।

img_6084tt

 

অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ৮১% বিবাহিত এবং ১৯% অবিবাহিত। যাদের ৪৮% একক পরিবারে এবং ৫২% যৌথ পরিবারে বেড়ে ওঠেছেন। ৮% অভিযুক্ত ব্যক্তি বেকার এবং ৪% ছাত্র হলেও ৮৮% অভিযুক্ত ব্যক্তি কোন না কোন আয়মূলক কাজের সাথে সম্পৃক্ত। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গড় মাসিক আয় ৬৯৭৭ টাকা এবং তাদের গড় পারিবারিক আয় ১৪৫৫৬ টাকা। জরিপের ফলাফল ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনা করে নির্দিষ্ট কোন পেশা বা গোষ্ঠীকে সুনির্দিষ্টভাবে নারী ও শিশু নির্যাতনের জন্য দায়ী করা যায় না। শিক্ষিত-নিরক্ষর, ধনী-দরিদ্র, সবল-দুর্বল, বেকার-কর্মে নিয়োজিত মানুষ নারী ও শিশু নির্যাতনের সাথে সম্পৃক্ত হচ্ছে। মূলত নারী ও শিশুদের প্রতি প্রচলিত সামাজিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সহিংসতা বাড়ছে।

 

সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যের আলোকেনারীর প্রতি সহিংসতা

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি কর্তৃক দেশের শীর্ষসস্থানীয় ২০১৫ সালে ১৪টি এবং ২০১৬ সালে ১৩টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বিগত দু’বছরের নারীর প্রতি সহিংসতাপরিসি’তির সারসংক্ষেপ নিচে তুলে ধরা হলো ঃ

  • সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ২০১৫ সালে ৫৫২২ এবং ২০১৬ সালে (অক্টোবর মাস পর্যন্ত) ৪১১৪ জন নারী ও শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে।
  • সংবাদপত্রে গড়ে প্রতিদিন ২০১৫ সালে ১৫জন এবং ২০১৬ সালে ১৪জন সহিংসতার শিকার নারীর সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৩ এবং ২০১৪ সালের তুলনায় সর্বসাকুল্যে ২০১৫ ও ২০১৬ সালে নারীর প্রতি সহিংসতা ৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা জ্যামিতিক হারে অর্থ্যাৎ ২০১৪ সালে ২০১৩ সালের তুলনায় ১০%, ২০১৫ সালে ৩৫% বেড়েছে।
  • বিগত দু’বছরে নারীর প্রতি সহিংসতার মাত্রা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নারীদের নৃশংস ও নির্মমভাবে আপনজনদের হাতেই খুন হতে হয়েছে। জনবহুল স’ানে রিশাকে হত্যা করা বা খাদিজা হত্যা চেষ্টা ঘটনায় উপসি’ত তরুণ-যুবদের নির্লিপ্ততা মানুষের চরম নিরাপত্তাহীনতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে ।
  • তথ্য-প্রযুক্তির দিক থেকে বাংলাদেশ এগুলেও এর নেতিবাচক প্রভাবে নারীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বেশি। নারীকে হেয় প্রতিপন্নকরতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বা নারীর অসর্তকতা কাজে লাগিয়ে তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে জীবনব্যাপী তাকে হয়রানি করা হয়। ফলে নারীরা হয়রানি বা লোক লজ্জা থেকে রেহাই পেতে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে।
  • ২০১৫ সালে ১৮৪৭ এবং ২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১৩০০ নারীকে হত্যা করা হয়েছে এবং ২০১৫ সহিংসতার শিকার হয়ে ৩০১ জন এবং ২০১৬ সালে ২৪৯ জন আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।

 

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদে সংরক্ষিত ১৪টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে জানুয়ারি-অক্টোবর, ২০১৬ এই সময়কালে ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধিসহ মোট ৪১৪৪ জন নারী ও কন্যা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন মোট ৮৭৫ জন তন্মধে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৩৪ জন, ধর্ষণের পর হত্য̈া করা হয়েছে ৩১ জনকে, এছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ১৪০ জনকে। উত্ত্যক্তকরণ ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে ৩৩১ জন তন্মধে উত্ত্যক্তকরণ করা হয়েছে ২৪০ জনকে, উত্ত্যক্তকরণ কারণে আত্মহত্যা করেছে ৮ জন, প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখান করায় নির্যাতন করা হয়েছে ১২ জনকে, যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৭১ জন।

 

২০১৫-১৬ সালে আলোচিত ঘটনার আলোকে নিচে সহিংসতার ধরণ অনুযায়ী নারী ও শিশু নির্যাতনের তথ্য তুলে ধরা হলো।

 

যৌন হয়রানি

২০১৬ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত ২৯৬ জন নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৩জন যৌন হয়রানির শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছে। ২০১৫ সালে ৩৬২জন যৌন হয়রানি বা যৌন হয়রানির ঘটনা প্রতিবাদ করতে গিয়ে সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যা ২০১৪ সালে তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি। দণ্ডবিধি-র ৫০৯ ধারা (যৌন হয়রানি সংক্রান্ত ধারা) ভ্রাম্যমান আদালতের (নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এর অধীন) আওতায় অর্ন্তভুক্ত করার পর থেকে যৌন হয়রানির মাত্রা ২০১৪ সাল পর্যন্ত কিছুটা কমেছিল। কিন’ ২০১৫ সাল থেকে যৌন হয়রানির ঘটনা বাড়ছে।

 

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের প্রেক্ষিতে জানা যায় যে,২৯ আগষ্ট, ২০১৬ ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত হয় প্রেমের প্রস্তাবে রাজী না হওয়ায় গত ২৪ আগষ্ট, ২০১৬ তারিখে ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী সুরাইয়া আক্তার রিশা মারা গিয়েছে। এ ঘটনার ২০ দিন পরেই ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ এ মাদারীপুরে নিতু মন্ডল নামের নবম শ্রেণীর এক স্কুল ছাত্রীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে (দৈনিক প্রথম আলো, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬)। ২০১৫ সালের পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় যৌন হয়রানিবছরের বহুল আলোচিত ঘটনা। গণমাধ্যম এ বিষয়ে ব্যাপক পর্যালোচনা ও ভিডিও ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও পুলিশ তদন্ত করে এ অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট কাউকেই সনাক্ত করতে পারে নি। এছাড়া নাটোর জেলায় প্রাক্তন স্ত্রীর, স্বামীর সাথে একান্ত মুহুর্তের ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয় প্রাক্তন স্বামী  (২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬,ভোরের কাগজ)। বরিশালের গৌরনদীতে নবম শ্রেণীর ছাত্রীকে অপহরণের পর ধর্ষণ করে মোবাইল ফোনে ভিডিও চিত্র ধারণ করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে চাঁদা আদায় করে (২৯ অক্টোবর,২০১৬,জনকন্ঠ)।

 

ফতোয়া

উচ্চ আদালতে ফতোয়া সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার পর থেকে ফতোয়ার মাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংসতা বা তাদের অধিকার হরণের হার কমে আসছে। ২০১৬ সালে ৭টি ফতোয়া সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে ২০১৫ সালে ২১ জন নারী ফতোয়ার শিকার হয়েছেন। তবে ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে ফতোয়ার ঘটনা ৪৩% হ্রাস পেয়েছে।এক ভন্ড পীরের ফতোয়া জারীর কারনে ফরিদগঞ্জ উপজেলার রুপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের প্রায় ৯০০০ নারী ভোটার ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিল (মার্চ ২৫,২০১৬ দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউন)।হিল্লা বিয়েতে রাজি না হওয়ায় রংপুর গঙ্গাচড়া উপজেলার আলমবিদিতর ইউনিয়নের নগর বড়াইবাড়ি গ্রামের শিরিনা বেগমসহ তার পুরো পরিবারকে, প্রায় দুই বছর ধরে একঘরে করে রেখেছে এলাকার  তথাকথিত ফতোয়াবাজরা (মে২৬, ২০১৬ দৈনিক সংবাদ)।মার্চ ১৪, ২০১৫দৈনিক জনকন্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায় বিয়ের কাবিনে প্রথম স্ত্রীর তথ্য গোপন করায় লালমনিরহাটে সমাজপতিরা নব বিবাহিত স্বামী-স্ত্রীকে বিচারের নামে দোররা মারা হয়েছে। পরিবারটির উপর ফতোয়া জারি করে এক ঘরে করে রাখা হয়।

ধর্ষণ

বিগত কয়েক বছর জ্যামিতিক হারে ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। ২০১৬ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত ৮৬৭ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের মতো বর্বরোচিত সহিংসতার শিকার হয়েছে। সংবাদপত্রে ধর্ষণের শিকার সকল নারী ও শিশুর বয়স উল্লেখ থাকে না। যাদের বয়স উল্লেখ রয়েছে তাদের মধ্যে ৯২ শতাংশ শিশু (১৮ বছরের নিচে বয়স) ধর্ষণের শিকার হয়েছে।২০১৬ সালে ৩৩ জন নারীকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং ১১জন ধর্ষণের শিকার হওয়ার কারণে আত্মহত্যা করেছে। অন্যদিকে২০১৫ সালে ১০৬৯ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যা ২০১৪ সালের তুলনায় ৩৫% বেশি। বয়স উল্লেখ রয়েছে এমন ধর্ষণের শিকার নারীদের মধ্যে ৭৮ শতাংশ শিশু (১৮ বছরের নিচে বয়স) ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

 

গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, কোমলমতি শিশুরা ধর্ষণের মতো পাশবিক নির্যাতনের লক্ষ্যবস’তে পরিণত হয়েছে।  ১৪ নভেম্বর, ২০১৬ একইদিনে ফরিদপুর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে দুইটি পৃথক ঘটনায় ধর্ষনের শিকার হয়েছে যথাক্রমে ৬ বছরের শিশু এবং ২০ বছরের শারীরিক প্রতিবন্ধী এক তরুণী। (দৈনিক সংবাদ-১৫ নভেম্বর, ১৬)। বহুল আলোচিত দিনাজপুরের পাঁচ বছরের শিশু ধর্ষণের ঘটনা, রাজধানীর শন্তিবাগ এলাকার দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী এবং দক্ষিণখান এলাকার ১৩ বছরের শিশু ধর্ষণের ঘটনাসহ (দৈনিক প্রথম আলো-৩০অক্টোবর,২০১৬)এই বছরে শিশু ধর্ষণের মত কিছু জঘন্য  ঘটনা ঘটেছে।২০১৫ সালের২৬ জুলাই দুপুরে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে তুমুল বৃষ্টির মধ্যে একা পেয়ে জুয়েল ও মিন্টু একটি ঘরে নিয়ে শিশু রুবিনাকে (৭) ধর্ষণ করে। এতে শিশুটির অনেক রক্তক্ষরণ হলে তাঁরা গলাটিপে হত্যা করে শিশুটির লাশ বস্তায় ঢুকিয়ে পার্শ্ববর্তী বিলের একটি  ঝোপে ফেলে দেয় (সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৫, দৈনিক প্রথম আলো)। এ রকম শত শত লোমহর্ষক শিশু ধর্ষণের ঘটনা আমরা গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পারি। সংবাদপত্র প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় গণপরিবহণেও নারীরা নিরাপদ নয়। চলন্ত লঞ্চের কেবিনে অস্ত্রের মুখে এক নারী (২০) ধর্ষণ এর শিকার হয়েছে (দৈনিক  কালের কন্ঠ-১৯ জানুয়ারি,২০১৬)। অন্যদিকে মধুপুরে চলন্ত বাসেও এক নারী গণধর্ষণ এর শিকার হয়েছে ( দৈনিক সমকাল-২ এপ্রিল, ২০১৬)। ২০১৬ সালের অন্যতম আলোচিত ঘটনা কলেজ ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুকে ধর্ষণের পর হত্যা। ২০ মার্চ, ২০১৬ কুমিল্লার সেনানিবাস এলাকাতে সোহাগী জাহান তনু নামের এক কলেজ ছাত্রীকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে (২২ মার্চ,২০১৬,কালের কন্ঠ)।তাঁর শরীর থেকে নেওয়া নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে ধর্ষণের আলামত মিলেছে বলে মামলার তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি নিশ্চিত করেছে (দৈনিক প্রথম আলো-১৭ মে, ২০১৬)।কিন’ পরিতাপের বিষয়, এ মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের এখন পর্যন্ত সিআইডি চিহ্নিত করতে পারে নি।

 

এসিড সন্ত্রাস

২০১৬ সালে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ৩৪ জন নারী এসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে। ২০১৫ সালে ৪৫জন নারী ও শিশু এসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে, যা ২০১৪ সালের তুলনায় ২২% কম। কঠোর আইন প্রণয়ন, আইনের প্রয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগের ফলে এসিড সন্ত্রাসের ঘটনা হ্রাস পাচ্ছে।তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসিড সন্ত্রাসের শিকার নারী ও শিশুদের মধ্যে ২৯%-ই প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায়, ১৮% শুক্রতার কারণে এবং ০৭% যৌতুক ও স্বামীকে দ্বিতীয় বিয়ে করার অনুমতি না দেওয়ায় অন্তত ০৭% সহিংসতার শিকার হয়েছে।

 

পাষান্ড স্বাামী ১০ হাজার টাকা যৌতুক না পেয়ে স্ত্রীর পূর্ণিমার মুখে এসিড ঢেলে দেয়। জীবনের সঙ্গে টানা ২৮ দিন যুদ্ধ করে মারা যায় বগুড়ার পূর্ণিমা (দৈনিক কালের কন্ঠ, ৩ ফেব্রয়ারী, ২০১৬)।যৌতুকের কারনে পাবনার সাইমা আক্তার ডলি (৩০) এসিড দগ্ধ হয় তার স্বমীর দ্বারা। এছাড়াও রাজধানীর আগারগাঁওয়ের তালতলা কলোনিতে পারিবারিক কলহের জন্য এসিড নিক্ষেপ করে স্ত্রীর গোপনাঙ্গ ঝলসে দিয়েছে তার স্বামী (দৈনিক জনকন্ঠ, ৩ নভেম্বর, ২০১৬)। জুলাই ২৩,২০১৫ দৈনিক আমদের সময় পত্রিকায় যশোরের শার্শায় এক বখাটে কর্তৃক সপ্তম শ্রেণীর এক স্কুলছাত্রীকে প্রেম নিবেদনে ব্যর্থ হয়ে এসিড নিক্ষেপের সংবাদ প্রকাশিত হয়। এতে মেয়েটির মুখ ও শরীরের কয়েকটি স’ান ঝলসে  যায়।

 

পাচার, অপহরণ ও উদ্বার

২০১৬ সালে ৫৮ জন পাচার, ১২৮জন  নিখোঁজ, ১৪১জন অপহরণ এবং ২২২জন নারীকে উদ্ধারের তথ্য সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে, ২০১৫ সালে ২৫ জন নারী ও শিশুর পাচার হওয়ার তথ্য সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া বিগত বছরে ২৭০ জন অপহরণ, ৭৮জন নিখোঁজ এবং ৭৬০ জন নারী ও শিশুর উদ্বারের তথ্য পুঞ্জিভূত হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের সংকলিত তথ্য থেকে দেখা যায়, জানুয়ারি-নভেম্বর ২০১৫ পর্যন্ত সময়ে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে ৮০৩টি মামলা দায়ের হয়েছে, যেখানে ৪৭৭ জন নারী ও শিশু পাচারের শিকার। কিন’ এই ১১ মাসে মাত্র ০৪জন অভিযুক্ত ব্যক্তি বিচারিক প্রক্রিয়ায় দোষী সাবস্ত হয়েছে। মামলার গতি তদন্ত থেকে বিচারিক প্রক্রিয়া পর্যন্ত অত্যন্ত শ্লথ হওয়ায় এবং অপরাধীদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি না করতে পারায় অপরাধের মাত্রা ক্রমশ বেড়ে চলছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নারীরা যাচ্ছেন চাকরির আশায়। কিন’ তারা প্রায়শ প্রতারনা ও নির্যাতনের শিকার হন। হাত-পা কাটা, আগুনে ছেঁকা ছাড়াও বিকৃত যৌন লালসার শিকার হয়। ২৮ এপ্রিল এক গৃহবধূকে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যদের মাধ্যমে লেবাননে নেয়া হয়। লেবাননের এয়ারপোর্ট থেকেই ওই গৃহবধূকে উক্ত দেশের পতিতালয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে তুলে দেয়া হয় (মে ২৮, ২০১৫; দৈনিক সংবাদ)। শারমিন পাঁচ বছর আগে এক দালালের মাধ্যমে লেবাননে যায় কিন’ লেবানন যাওয়ার পর থেকেই তার সাথে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে (দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৪ জানুয়ারি, ২০১৬)।১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ তারিখের দৈনিক প্রথম আলো সহ বিভিন্ন পত্রিকার মাধ্যমে জানা যায় পাঁচ দিন আগে গ্রামের মাঠে খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়া চার কোমলমতি শিশুদের লাশ উদ্ধার হয় গতকাল ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ তারিখে। অপহৃত ছোট্ট শিশুর কান্না থামাতে না পেরে পলিথিনের ব্যাগে ঢুকিয়ে হত্যা করা হয় (দৈনিক কালের কন্ঠ, ১৮ এপ্রিল, ২০১৬)। ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে  ভারতে পাচারকালে সাতক্ষীরার তলুইগাছা সীমান্ত থেকে ছয়জনের মধ্যে দুইজন নারী ও একজন শিশুকে উদ্ধার করা হয় (ফেব্রুয়ারী ৬, ২০১৬ দৈনিক জনকন্ঠ)। জোড়পূর্বক পতিতাবৃত্তি করানো হচ্ছিল এমন ৩ তরুণীকে চট্টগ্রাম থেকে উদ্ধার করা হয় (ডেইলি স্টার, ১১ মার্চ, ২০১৬)।

 

পারিবারিক সহিংসতা

সংবাদপত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঘরের মধ্যেই নারীরা সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ জীবন-যাপন করেন। ২০১৬ সালে ৬৯০ জন নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছে, যাদের ৫৮ শতাংশকে স্বামী বা তার স্বজনরা হত্যা করেছে এবং ১৪ শতাংশ সহিংসতা সহ্য না করতে পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। অন্যদিকে, ২০১৫ সালে ৯৯৬জন নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪৮ শতাংশকে (৪৮২জন) স্বামী হত্যা করেছে এবং পারিবারিক সহিংসতার কারণে ১৪৫জন ( মোট পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারী ও শিশুর ১৫%) আত্মহত্যা করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রকাশিত নারীর প্রতি সহিংসতা সংক্রান্ত জরিপ ২০১৫ এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বিবাহিত নারীদের ৮০ শতাংশই জীবনের কোনো না  কোন পর্যাযে নিজের স্বামীর মাধ্যমে অথবা অন্য কোনোভাবে শারীরিক, মানসিক, যৌন কিংবা অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে আমরা নির্যাতনের যে ঘটনাগুলি দেখি তার চেয়ে অনেক বেশি নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে, যেগুলি অপ্রকাশিত থেকে যাচ্ছে, যার বাস্তব চিত্র আরো ভয়াবহ এবং উদ্বেগজনক। ঘরের মধ্যে অতি আপনজন কর্তৃক নারী ও শিশুর হত্যা বা আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার ঘটনানারী ও শিশুর ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতার চিত্র প্রকাশ করে। বস’ত, সংবাদপত্রে মূলত আলোচিত ও ভয়াবহ পারিবারিক সহিংসতার তথ্য প্রকাশিত হয়।

 

স্বামীর নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ফারিয়া লারা ফাউন্ডেশনের বামনা উপজেলার ডৌয়তলা অফিসের কর্মকর্তা সবিতা রানি (২৮) আত্মহত্যার চেষ্টা করেন (দৈনিক সংবাদ ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬)।স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ীর লোকজনেরা পারিবারিক কলহের জের ধরে ভৈরবে স্ত্রীকে মাথা নেড়া করে বর্বর  নির্যাতন করেছে (দৈনিক জনকন্ঠ ২০ মার্চ, ২০১৬)।পরকীয়া করার সন্দেহে লঞ্চের কেবিনে মিনারা বেগমকে (২৮) হত্যা করে তার স্বামী  (নিউ এউজ ১৭আগস্ট, ২০১৬)।টঙ্গীর জামাইবাজার এলাকার ভাড়া বাসায় স্বামী জুয়েল হাসান চাকু দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে শিউলির চোখ তুলে তাকে ভেতরে রেখেই বাসা তালাবদ্ধ করে চলে যায়। পরে শিউলির চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা পুলিশের সহায়তায় ঘরের তালা ভেঙে তাকে উদ্ধার করে। মানুষটির চোখ দু’টির ওপর পাশবিক বর্বরতা চালানো হয়। বাঁ চোখের ‘আই বল’ তুলে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। ডান চোখের ‘আই বল’ একেবারে তুলে ফেলা না হলেও ক্ষতবিক্ষত করে চিরদিনের জন্য অকেজো করে ফেলা হয়েছে। দুই চোখেরই পাতাগুলো ছিন্নভিন্ন করে ফেলা হয় (৮ নভেম্বর, ২০১৫; দৈনিক কালের কণ্ঠ)।

 

যৌতুকের কারণে নির্যাতন

২০১৬ সালে ২৬৬জন নারী যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যেখানে ১১৬জন নারীকে হত্যা করা হয়েছে এবং ৯জন আত্মহত্যা করেছে। ২০১৫ সালে যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার ৩৯২ জন নারী, যা ২০১৪ সালের তুলনায় ২৮% বেশি। এদের মধ্যে ১৯২জনকে হত্যা করা হয়েছে এবং যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার ১৮জন আত্মহত্যা করেছে।

 

বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলার লিয়া খানম নামের নববধূকে যৌতুকের জন্য স্বামী ও শ্বাশুরী হত্যা করেছে (৫ আগষ্ট,২০১৬,জনকন্ঠ)। বিয়ের মাত্র ২৩ দিনের মধ্যে যৌতুকের জন্য গাছের সাথে বেঁধে নির্যাতন করা হয় টাঙ্গাইলের মধুপুরের সালমা নামের একজন তরুনীকে (২১ আগষ্ট,২০১৬,সমকাল)। ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় যৌতুকের দাবীতে অন্তসত্ত্বা সুমিকে শ্বশুরবাড়ির সবাই মিলে শারীরকভাবে নির্যাতন করেছে (২১ জুলাই,২০১৬,দৈনিক সংবাদ)।১৭ জুলাই, ২০১৫ ঢাকা জেলার সাভারের জিঞ্জিরার কলমা গ্রামের ভাড়া বাসায়  দেড় লাখ টাকা যৌতুকের জন্য ইলেকট্রিক টেস্টার দিয়ে সুখীর এক চোখ উপড়ে ফেলে স্বামী রবিউল, ভাসুর, দেবর ও ননদ। ডান চোখ উপড়ে ফেলার পর বাম চোখেও আঘাত করে তারা। এলাকাবাসী সুখীকে উদ্ধারের পর হাসপাতালে নিয়ে যায়। আর রবিউলকে আটক করে তুলে দেয় পুলিশের হাতে। (০৫ আগস্ট ২০১৫. দৈনিক যুগান্তর)।

 

গৃহকর্মী নির্যাতন

২০১৬ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত ৭৫ জন গৃহকর্মী বিভিন্ন ধরণের সহিংসতার শিকার হয়েছেন। যাদের ১৩জনকে হত্যা করা হয়েছে এবং ৬জন আত্মহত্যা করেছেন। গৃহকর্মী নির্যাতনের হার বিগত কয়েক বছরের তুলনায় সর্বাধিক। ২০১৫ সালে ৪৮ জন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের ১৫জনকে হত্যা এবং ১৬ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ২০১৫ সালে গৃহকর্মীদের জন্য ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা’ অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এর ফলে গৃহকর্ম  শ্রম হিসেবে স্বীকৃতি পাবে এবং সবেতনে চার মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি ছাড়াও অন্য ছুটি ভোগ করতে পারবেন গৃহকর্মীরা। শ্রম আইন অনুযায়ী গৃহকর্মীরা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাবেন।সর্বনিম্ন ১৪ বছরের কাউকে গৃহকর্মী নিয়োগ দেওয়া যাবে। গৃহকর্মীদের শ্রমঘণ্টা এবং  বেতন আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করতে হবে।আমারা এই নীতিমালার যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন প্রত্যাশা করছি।

 

দিনাজপুরে ১০ বছরের শিশু ইয়াসিনকে অমানবিকভাবে শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে দিনের পর দিন (২৭ আগষ্ট,২০১৬,কালের কন্ঠ)। কুমিল্লায় ৫ বছরের শিশু পলিকে নির্দয়ভাবে নির্যাতন করে ঘরে বন্দি করে রাখা হয়েছিল (২২ অক্টোবর, ২০১৬,কালের কন্ঠ)। ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ ক্রিকেটার শাহাদাতের স্ত্রীর বিরুদ্ধে ১১ বছর বয়সী গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। উক্ত গৃহকর্মীকে উদ্ধারের সময় তার শরীরে প্রচুর নতুন ও পুরনো নির্যাতনের চিহ্ন ছিল (অক্টোবর ৫, ২০১৫, দৈনিক সমকাল)। কিন’ অক্টোবর ২০১৬ এ ক্রিকেটার শাহাদাত ও তার স্ত্রীকে এ মামলা থেকে অভিযোগ প্রমাণিত হয় নি মর্মে খালাস দেওয়া হয়। ১৯আগস্ট, ২০১৫ সাতক্ষীরা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটেটের বাসা থেকে নির্যাতিত শিশুকে গুরুতর আহত অবস’ায় উদ্ধার করে পুলিশ। শিশুটির উপর বিভিন্নভাবে নির্যাতন করতেন উক্ত ম্যাজিস্ট্রেটের স্ত্রী। উদ্ধার করার সময় মেয়েটির মাথার চুল কাটা ছিল এবং তার হাতে, পিঠে ও কোমরের নিচে আগুনে পোড়াসহ একাধিক স’ানে ক্ষত ছিল (আগস্ট ৮, ২০১৫, দৈনিক নয়াদিগন্ত)।দায়িত্বশীল কিংবা জনপ্রিয় কোন ব্যক্তির ঘরেগৃহকর্মী নির্যাতনের এ ধরণের ঘটনা আমাদের বিচলিত করে।

 

পুলিশ সদর দপ্তরের সংকলিত তথ্য

পুলিশ সদর দপ্তরের সংকলিত নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার সংখ্যা পর্যালোচনা থেকে দেখা যায় ২০১৪ সালে ২১২৯১ টি মামলা হলেও ২০১৫ সালে ২১২২০টি মামলাএবং ২০১৬ সালে ১৭০৮৪ মামলা (প্রাক্কলিত, ১০ মাসে ১৪২৩৭ মামলা) রেকর্ড হয়েছে। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় ২০১৬ সালে মামলা অনেক কম হয়েছে। অথচ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপের ফলাফল এবং সংবাদপত্রে প্রকাশিত সহিংসতার তথ্য অনুযায়ী মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। সহিংসতার শিকার হয়েও মামলা না করা বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ। নারী ও শিশু বান্ধব বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত না করতে পারা, মামলা করতে গিয়ে নানাবিধ হয়রানির শিকার হওয়া, বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা ও অন্যায় প্রভাব সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের আইনের আশ্রয় নিতে নিরুৎসাহিত করছে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশে প্রতিদিন ৬০টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলা দায়ের হয়, ঘন্টায় ২.৪৭টি মামলা এবং ২০১৬ সালে তা কমে দিনে ৪৭টি এবং ঘন্টায় ২টিতে দাঁড়িয়েছে। সর্বাধিক মামলা ঢাকা রেঞ্জে এবং সর্বনিম্ন রেলওয়ে রেঞ্জে মামলার রেকর্ড পরিলক্ষিত হয়েছে।

 

উপসংহার এবং সুপারিশ

সরকার নারী ও শিশুর উন্নয়নে নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করায় প্রশংসার দাবি রাখলেও নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে নারীবান্ধব স্বাধীন বিচার ব্যবস’া নিশ্চিত করার বিষয়ে বিশেষ কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় এ ধরণের সহিংসতা দিন দিন বেড়ে চলেছে। নারীর প্রতি সহিংসতা চলতে থাকলে নারীর অগ্রযাত্রার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। সমাজের মধ্যে নানা ধরণের অসি’রতা ও নিরাপত্তাহীনতার পরিসি’তি বিরাজ করছে। সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। জনসম্মুখে সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও, প্রতিরোধে ও প্রতিকারে  কেহ এগিয়ে আসছে না। এসব ক্ষেত্রে সাহসী ও কার্যকর পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

 

নারী ও শিশুর জন্য নিরাপদ ও সহিংসতামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিচার বিভাগ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, আইনজীবী, গণমাধ্যম, শিক্ষক, কর্পোরেট সেক্টর, এনজিও এবং অন্যান্যদের সমন্বয়ে জাতীয় পর্যায়ে একটি মনিটরিং কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। এই কমিটি নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধে বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগে সক্রিয়ভাবে যথাযথ কৌশল নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করতে পারবে।

সমিতির আহ্বান

নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা বন্ধে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি সমিতির আহ্বানঃ

  • পরিবার থেকে শুরু করে কমিউনিটি ও জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা;
  • নারী ও শিশু নির্যাতনপ্রতিরোধ ও সচেতনতা কার্যক্রমে পুরুষদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং প্রতিরোধ কার্যক্রমে তাদের অঙ্গীকার আদায় করা;
  • নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে গৃহিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনাকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা;
  • আইনে উল্লেখিত সময়-সীমার মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলার তদন্ত কাজ সম্পন্ন করতে ‘আলাদা তদন্ত সেল’ করতে হবে এবং তদন্ত নিয়োজিত ব্যক্তিদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে;
  • নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধির একটি বড় কারণ হচ্ছে নির্যাতনকারীর শাস্তি না হওয়া। যেখানে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার হওয়ার কথা, সেখানে দেখা যায়৫ থেকে ১০ বছর লেগে যাচ্ছে। বিচার দ্রুত হলে এবং মামলার রায় দ্রুত কার্যকর হলে নারী নির্যাতনের হার শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে আমরা বিশ্বাস করি। তাই মামলা অনুপাতে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা ও বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে;
  • মানব পাচার সংক্রান্ত মামলাগুলি বর্তমানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচার হয়ে থাকে যাতে এ ট্রাইব্যুনালের উপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এ কারনে অতিশীঘ্র পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন জেলায় মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ এর অধীনে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে;
  • নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২, পর্ণোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২সহ নারী ও শিশু নির্যাতন রোধে বিদ্যমান অন্যান্য আইনের অধীন দায়েরকৃত মামলাসমূহ নিয়মিত মনিটরিং এর আওতায় আনা যেন আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলাসমূহ নিষ্পত্তি হয় এবং অপরাধীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়;
  • সর্বোপরি নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে দৃঢ়তার সাথে কাজ করা এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

 

নারীর প্রতি সহিংসতা বিষয়ে আর চুপ থাকার সুযোগ নেই। সহিংসতার শিকার নারী কিংবা তার স্বজনকে প্রতিবাদ করতে হবে, অন্তত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধেকথা বলতে হবে। সহিংসতার ফলাফল সব সময়ই নেতিবাচক। তাই প্রতিকার ব্যবস্থা চেয়ে প্রতিরোধ কার্যক্রমই বেশি জরুরী।

 

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি কর্তৃক দেশের শীর্ষস্থানীয় ২০১৫ সালে ১৪টি এবং ২০১৬ সালে ১৩টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বিগত দু’বছরের নারীর প্রতি সহিংসতার একটি  তুলনামূলক চিত্র নিম্নে তুলে ধরা হলঃ

ক্রম ধরন জানুয়ারি-ডিসেম্বর ২০১৫ জানুয়ারি-অক্টোবর ২০১৬ জানুয়ারি-ডিসেম্বর ২০১৬ (প্রাক্কলিত)
1 যৌন হয়রানি(including stalking) 362 296 355
2 কমিউনিটি ভায়োলেন্স 1456 1331 1597
3 ফতোয়া 21 6 7
4 ধর্ষণ 1069 867 1040
5 এসিড সন্ত্রাস 45 34 41
6 পাচার 25 58 70
7 অপহরণ 270 128 154
8 নিখোঁজ 78 141 169
9 উদ্ধার 760 222 266
10 পারিবারিক নির্যাতন 996 690 828
11 যৌতুক 392 266 319
12 গৃহকর্মী (হত্যা/ধর্ষণ/ নির্যাতন) 48 75 90
মোট 5522 4114 4937

Newspaper Link:

  1.   http://www.banglatribune.com/others/news/160653/%E0%A6%A6%E0%A7%81%E0%A6%87-%E0%A6%AC%E0%A6%9B%E0%A6%B0%E0%A7%87-%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%80%E0%A6%B0-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A6%BF-%E0%A6%B8%E0%A6%B9%E0%A6%BF%E0%A6%82%E0%A6%B8%E0%A6%A4%E0%A6%BE-%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A7%9C%E0%A7%87%E0%A6%9B%E0%A7%87-%E0%A7%AB-%E0%A6%B6%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B6
  2. http://www.dhakatribune.com/bangladesh/crime/2016/11/27/bnwla-15-boys-commit-violence-women/
  3. http://bangla.samakal.net/2016/11/27/252107
  4. http://www.dhakatribune.com/bangladesh/crime/2016/11/27/bnwla-15-boys-commit-violence-women/
  5. http://www.kalerkantho.com/home/printnews/434564/2016-11-28
  6. http://www.banglanews24.com/national/news/536417/%E0%A7%A8%E0%A7%A8-%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A7%87-%E0%A6%B8%E0%A6%B9%E0%A6%BF%E0%A6%82%E0%A6%B8%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A7%AF%E0%A7%AC%E0%A7%A9%E0%A7%AC-%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%80
  7. http://www.dainikamadershomoy.com/todays-paper/last-page/50129/%E0%A7%A8%E0%A7%A8-%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A7%87-%E0%A7%AF%E0%A7%AC%E0%A7%A9%E0%A7%AC-%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%80-%E0%A6%B8%E0%A6%B9%E0%A6%BF%E0%A6%82%E0%A6%B8%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0
  8. http://bangla.samakal.net/2016/11/28/252343
  9. http://www.thedailystar.net/city/demand-rings-louder-scrapping-special-provision-1321480
  10. http://www.bhorerkagoj.net/print-edition/2016/11/28/118460.php
  11. http://www.newspapers71.com/335444/%E0%A6%A6%E0%A7%81%E0%A6%87%20%E0%A6%AC%E0%A6%9B%E0%A6%B0%E0%A7%87%20%E0%A6%B8%E0%A6%B9%E0%A6%BF%E0%A6%82%E0%A6%B8%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%B0%20%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0%20%E0%A7%AF%E0%A7%AC%E0%A7%A9%E0%A7%AC%20%E0%A6%9C%E0%A6%A8
  12. http://www.thedailysangbad.com/last-page/2016/11/28/94990
  13. http://www.jugantor.com/city/2016/11/28/80551/%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%B7-%E0%A6%A7%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BE-%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%96%E0%A6%B2%E0%A7%87-%E0%A6%86%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%AC-%E0%A6%86%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%8B%E0%A6%B2%E0%A6%A8-%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A6%AC
  14. http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/1029209/%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%B7-%E0%A6%A7%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BE-%E0%A6%A5%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%B2%E0%A7%87-%E0%A6%86%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%AC